ভাই, প্লিজ একটা টিকিট, প্লিজ একটাই তো’, শুনে ভাববেন না যে আজকের শ্রীলঙ্কা-পাকিস্তান ফাইনাল দেখার জন্য কারো মরিয়া অনুরোধ। আসলে অগ্রিম কিনে ফেলা একগুচ্ছ টিকিটের অন্তত একটি বিক্রি করে ক্ষতি কমাতে চাচ্ছেন তিনি! তাই শনিবারের নিস্তরঙ্গ দিনে নির্বিবাদী কেউ যদি ক্রিকেটীয় আনন্দ পেতে চান, তাহলে চলে আসুন মিরপুরের শেরে বাংলা জাতীয় স্টেডিয়ামে, কালোবাজারেও পেয়ে যেতে পারেন সস্তার টিকিট! ১৯৮৮, এমনকি ২০০০ সালের এশিয়া কাপ ফাইনালে উপচে পড়া ভিড় ছিল বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়ামে। ব্যতিক্রম ঘটেনি মিরপুরে অনুষ্ঠিত গত আসরের ফাইনালেও।
তবে আগের দুইবারের চেয়ে ২০১২ এশিয়া কাপ ফাইনালের আগে টিকিটের জন্য হাহাকারের প্রধান কারণ ছিল বাংলাদেশ দল। সময়ের প্রবাহে ক্রিকেট আকর্ষণের কেন্দ্রে ভারত-পাকিস্তানকে সরিয়ে নিজের দলকেই মনে ধারণ করেছে এ দেশের মানুষ। প্রত্যাশা এতটাই বাড়িয়েছেন মুশফিকুর রহিমরা যে ফাইনাল থেকে ছিটকে পড়ায় বাংলাদেশ-শ্রীলঙ্কা ম্যাচেও ফাঁকা থেকে যায় গ্যালারির অনেকাংশ। সেখানে পাকিস্তান-শ্রীলঙ্কা ম্যাচ দেখার জন্য দৈনন্দিন জীবনযাত্রার ‘বিঘ্ন’ ঘটাবেন, এতটা আশা আয়োজকদেরও নেই। তবু স্টারভ্যালু বলে একটা কথা আছে। পর পর দুই ম্যাচে ছক্কার পর ছক্কায় আসর জমিয়ে ফেলা শহিদ আফ্রিদির সে আকর্ষণ আছে। কিন্তু তিনিই আজ মাঠে থাকবেন কি না, তা নিয়ে ঘোর সংশয়ের কথা কাল জানিয়েছেন পাকিস্তান দলের ম্যানেজার জাকির খান, ‘আফ্রিদির শুশ্রূষা চলছে। কাল নিশ্চিত হতে পারব যে সে খেলতে পারবে কি না।’ উমর গুল, আহমেদ শেহজাদ ও শারজিল খানও নাকি টুকটাক চোটের সঙ্গে ‘বোঝাপড়া’ করছেন। পরের তিনজনের ‘টিআরপি’ অতটা নেই বাংলাদেশের দর্শক মহলে। কিন্তু ‘বুম বুম’ আফ্রিদি না খেলতে পারলে সেটি হবে আয়োজকদের জন্য চূড়ান্ত বিপর্যয়! অগত্যা ভরসা এশিয়া কাপের সম্প্রচারকারী প্রতিষ্ঠান স্টার স্পোর্টসের প্রচারণা। বাণিজ্যিকভাবে বিশ্বের সবচেয়ে সফল ভারত ও স্বাগতিক বাংলাদেশের অনুপস্থিতি সত্ত্বেও এবারের এশিয়া কাপ ফাইনালও যে রুদ্ধশ্বাস হবে, সে প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন উপমহাদেশের ‘হাইলি পেইড’ ক্রিকেট বিশ্লেষকরা। সে সম্ভাবনা উড়িয়েও দেওয়া যায় না। কুমার সাঙ্গাকারা, মাহেলা জয়াবর্ধনে ও লাসিথ মালিঙ্গার মতো তারকা মাঠে নামছেন শ্রীলঙ্কার জার্সি গায়ে। পাকিস্তানের সাঈদ আজমলের বর্তমান সময়ের সেরা অফস্পিনার। মিসবাহ-উল হক, মোহাম্মদ হাফিজ ছাপিয়ে নায়ক হওয়ার সামর্থ্য রয়েছে উমর আকমলের। দুই দলের এ ভারসাম্যের মাঝে রয়েছে জমজমাট ম্যাচের প্রতিশ্রুতি। এবারের আসরের পুল ম্যাচটি যেমন, লাসিথ মালিঙ্গার অসাধারণ এক স্পেলে জয়ের পথ থেকে ছিটকে হারের খাদে পড়ে পাকিস্তান। আফ্রিদি মাঠে না থাকলে নিশ্চিতভাবেই গ্যালারির নজর থাকবে শ্রীলঙ্কার এ ফাস্ট বোলারের ওপরই। টি-টোয়েন্টির ঝোড়ো হাওয়া কেমন যেন ধুলোর আস্তর জমিয়ে দিয়েছে জয়াবর্ধনে কিংবা সাঙ্গাকারার ব্যাটিং শিল্পের সমঝদারদের মনে! বিপর্যয় থেকে দলকে মিসবাহর টেনে তোলার সংগ্রাম কিংবা হাফিজের খেটে খাওয়া ব্যাটিংয়ের চেয়ে উমর আকমলের ব্যাটিংই বেশি চিত্তাকর্ষক। কারণ পাকিস্তানি এ মিডল অর্ডার ব্যাটসম্যান যে পাওয়ার হিটিংটা জানেন! অবশ্য সীমিত ওভারের ক্রিকেটে শিল্প-টিল্প আদমজী জুট মিলের মতোই বিস্মৃতপ্রায়! ফাস্ট বোলার বল ছাড়ার পরই সবার চোখ স্ক্রিনে, বলের গতি জানার জন্য। ম্যাচ পরিস্থিতির চেয়ে ছক্কার দূরত্বই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। উইকেট পতন কিংবা ওভার বিরতিতে ডিজের কান ঝালাপালা চিৎকার, খেলোয়াড়ের চেয়ে গ্যালারির মুখ ফ্রেমে ধরতে টিভি ক্যামেরাম্যানের অধিক আগ্রহ মিলিয়ে ক্রিকেট মানেই মহা হুলস্থূল কাণ্ড! মাঠের ভেতরে অবশ্য চমকে দেওয়ার একটা উপায়ই জানেন পাকিস্তান অধিনায়ক মিসবাহ, ‘দুটি ক্লোজ ম্যাচ জেতার পর দলের সবাই দারুণ আত্মবিশ্বাসী। এটা আমাদের সাহায্য করবে।’ আত্মবিশ্বাসের তেজেই আফ্রিদি না খেলতে পারলেও খুব একটা বিচলিত নন তিনি, ‘আমরা যেকোনো পরিস্থিতির জন্য তৈরি। অবশ্যই শীর্ষস্থানীয় ক্রিকেটারদের কারো থাকা না থাকাটা গুরুত্বপূর্ণ। তবে আমাদেরও মনোবল চাঙ্গা আছে। হয়তো খেয়াল করেছেন যে শারজিলের অনুপস্থিতিতে আলম (ফাওয়াদ) ভালো খেলেছে। জয়ের তাড়নাটাই প্রধান, সেটা আমাদের আছে। এ অবস্থায় কারো অনুপস্থিতি পুষিয়ে দেওয়ার ব্যাপারে আমরা যথেষ্ট আত্মবিশ্বাসী।’ আগের দিন ম্যাচ থাকায় কাল অনুশীলনই করেনি শ্রীলঙ্কা দল। তবে বৃহস্পতিবারের ম্যাচের পর সংবাদ সম্মেলনে এসে টিসারা পেরেরা জানিয়ে গেছেন দলের ‘ফাইনাল’ ভাবনা, ‘বাংলাদেশে এবারের সফরে আমরা এখনো কোনো ম্যাচ হারিনি। আশা করি, এ জয়রথ ফাইনালেও এগিয়ে যাবে।’ যদিও বাংলাদেশে শ্রীলঙ্কার ‘ফাইনাল’ ভাগ্য মোটেও সুবিধার নয়। বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত এশিয়া কাপের চারটি আসরে এনিয়ে দ্বিতীয়বার ফাইনালে ওঠা লঙ্কানদের ২০০০ সালে সন্তুষ্ট থাকতে হয়েছিল রানারআপ ট্রফি নিয়েই। সেবারের ফাইনাল ৩৯ রানে জিতেছিল পাকিস্তান। তবে টুর্নামেন্ট সাফল্যটা আবার বেশি লঙ্কানদের। সাঙ্গাকারাদের সামনে রয়েছে এশিয়া কাপের পঞ্চম ট্রফি জয়ের হাতছানি, আর বর্তমান চ্যাম্পিয়ন পাকিস্তান জিতলে লাহোরের ক্রিকেট একাডেমির শোকেসে রাখা হবে তৃতীয় ট্রফিটি। ওদিকে পরিসংখ্যান আবার ঝুঁকে আছে আফ্রিদিদের দিকে, দুই দলের মধ্যকার ১৩৮ ম্যাচে পাকিস্তান জিতেছে ৮০টি। সবশেষ আবুধাবিতে অনুষ্ঠিত দ্বিপক্ষীয় সিরিজও পাকিস্তান জিতেছে ২-১ ব্যবধানে। তবে প্রায় দেড় মাসের অভিজ্ঞতায় বাংলাদেশকে ‘হোম’ বানিয়ে ফেলা শ্রীলঙ্কা জয়ী দুই দলের শেষ দ্বৈরথে। ফতুল্লার সেই সাফল্য কি আজকের ফাইনালেও টেনে আনতে পারবে লঙ্কানরা? নাকি..., থাক, অত হিসাব-নিকাশের ঝক্কি না নিয়ে নির্বিবাদে ম্যাচটা উপভোগ করাই শ্রেয়। দ্বাদশ এশিয়া কাপের ফাইনাল জমিয়ে তোলার জন্য এর চেয়ে ভালো কোনো ‘প্রচারণা’ যে আর খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না!


No comments for: "আজ ফাইনাল"
Leave a Reply