এখনো ভালোবাসি তোমায়...
আজিম উল্যাহ হানিফ
প্রায় দুইমাস হতে চলেছে মায়ার কোন যোগাযোগ নাই। কল করা তো দূরে থাক। আমার ও অবশ্য কল দেয়া হয় না। অথচ একসময় ২/৪ মিনিট পেরোলেই ২/১টি মিসকল পেতামও আমি ও দিতাম। অথচ আজ দুইমাস ১টি কল ও দিই না,পাই ও না। তার মানে দেখতে দেখতে ষাটদিন পার হয়ে গেছে! মায়া একদিন কলেজের কমনরুমে ডেকে নিয়ে হাতে হাত রেখে চোখে চোখ রেখে বলেছিল আজিম তুমি আমাকে কখনো ভুলে যাবে না তো।জীবনে প্রথম কোন অষ্টাদশী মেয়ের স্পর্শ পেয়ে যেমন লজ্জা লাগছিল তেমনি তার স্পর্শ পেয়ে আমার সারা দেহে যৌবনের দোলা দিয়ে গেল। আমি তার হাতের ছোয়ায় একটু স্বপ্ন রাজ্যে হারিয়ে গেলাম। তার কথায় আমার খেয়াল ভাঙ্গল। সে আরো বলে যাচ্ছে তুমি আমাকে ছেড়ে চলে গেলে আমি বাচবোঁ না। আমি আমার চিরচরিত নিয়ম বা অভ্যাস অনুযায়ী হাত নেড়ে ও চোখের ইশারায় জানান দিলাম যে আমি তোমারই আছি,থাকবো ইনশাল্লাহ। তারপর থেকে শুক্রবার ছাড়া প্রতিদিনই কলেজে আসা হতো দুইজনের। মায়ার হাসি ও হাসিভরা মুখ আমাকে মুগ্ধ করতো। কলেজে এসেই একজন আরেকজন না দেখলে মুঠোফোনে হুংকার ছাড়া হতো তোমার কলেজে আসতে এত দেরি! কলেজে এসে দুইজনের আড্ডা,গল্প করা,দুষ্টুমি সহ কলেজ সময় গুলো পার হয়ে যেত। সেই সাথে দেশের পরিস্থিতি,রাজনীতি,সামাজিক ও পারিবারিক সহ বিভিন্ন নানান বিষয় ও আড্ডা থেকে বাদ যেতো না। সবই আলাপ ও আলোচনা হতো। মায়া প্রচুর পত্রিকা পড়তো। বৃহত্তর লাকসাম তথা কুমিল্লার স্থানীয় দৈনিক ও সাপ্তাহিক ছাড়া জাতীয় পত্রিকা গুলো ও পড়তো। আর আমি ও টুকটাক লেখালেখি করতাম। যার ফলে সেই পত্রিকা গুলো আমার থেকেই নিতো। আমি মায়াকে উৎসর্গ করে বেশ কয়েকটি কবিতা লিখেছি। যার একটি স্থানীয় সাপ্তাহিক সময়ের দর্পণে প্রকাশ ও পেয়েছে। প্রকাশিত কবিতাটি খামে করে মায়াকে দিলে মায়া আমাকে সারারাত মুঠোফোনে আনন্দে কেদেঁছিল। আর বলেছিল তুমি আমাকে এত ভালবাস। দুইদিন কলেজ বন্ধ থাকায় এর পরদিন মায়া কলেজে এসে প্রথমে আমার কবিতা পড়ে পুরষ্কার স্বরূপ ৫০টাকা দিয়েছিল। আমি এগুলো দিয়ে লাকসাম পত্রিকা অফিসে গিয়েছি। আর বাকী টাকা দিয়ে একদিস্তা কাগজ কিনে খাতা বানিয়ে সেই খাতায় মায়াকে উৎসর্গ করে প্রায় অর্ধ শতাধিক কবিতা লিখেছি। কলেজ আড্ডা ছাড়া ও মুঠোফোনে মেতে উঠতাম আমরা দুইজন। সারাদিনেই মিসকল আর একজন না একজন কল করে খোজঁখবর নিতাম। একপর্যায়ে এসে এইচএসসি পাশ করে লাকসাম ফয়জুন্নেছা কলেজে ভর্তি হবো ভেবে লাকসামের একটি মেসে চলে আসলাম। ৬ মাস পর লাকসাম পড়বো না কিংবা ভর্তি হবো না জেনে কুমিল্লা চলে আসি। কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজে ভর্তি হয়েছি। তবু মায়ার সাথে কথা চলতো, সর্ম্পক ছিল অটুট। সে গ্রামের একটি ডিগ্রি কলেজে ভর্তি হয়েছে। সারাদিন টিউশনি আর কলেজ,রাতে কিছুক্ষন লেখালেখি আর মায়ার সাথে মুঠোফোনে আড্ডায় কবিতা পাঠ করে শুনানো এই ছিল রুটিন মাফিক কাজ। ইবাদত বন্দেগী আর নামাজ তো অবশ্যই আছে। গত বছর রোযার মাসে সেহরীর সময় নিয়মিত সবার আগেই ঘুম থেকে জেগেই মায়া আমাকে জাগাতো। আমি তার কল পেয়ে নিজে জাগতাম,মেসের অন্যদের ও জাগাতাম। মায়ার পান্ডিত্য,বুদ্দি,মেধা,বিচক্ষনতা,আমাকে আনন্দ দিতো। আমি ওকে মুঠোফোনের মেসেজে ধন্যবাদস্বরূপ মেসেজ পাঠাতাম ও ভালোবাসি এই কথাটি বেশি বেশি মেসেজ করতাম। বিভিন্ন খোজখবর লেখালেখি,পড়াশুনা,সাংবাদিকতাসহ দেশের কোন খবরই বাদ যেতো না,যায় না।অবশেষে দেশের প্রেক্ষাপট পরিবেশ দ্রুত বদলাতে থাকে। সেই সাথে মায়াও। আমি ঘুমন্ত অবস্থায় জেলে গেলাম। বের হতে না হতেই জানতে পারলাম মায়া ঢাকা কলেজের জনৈক ছাত্রের সাথে সম্পর্ক তৈরি করে নিয়েছে। আমি দ্রুত আত্মীয়দের কাছ থেকে টাকা ধার নিয়ে মুঠোফোন ও সিম ক্রয় করে পুনরায় মায়ার নাম্বার সংগ্রহ করে কল দিলাম। চিরপরিচিত মায়া ও এমনভাবে কথা বলল-যেন সে আমাকে চিনেই না।আমি ও ঠান্ডা মাথায় তাকে বুঝাতে থাকি। কিন্তু কে কাকে বুঝবে? মায়াকে আমাকে বুঝ দেয় অন্যভাবে। আমি মায়ার পরিবর্তন দেখে হতাশ হয়ে পড়ি।তার কথা কিছুতেই মেনে নিতে পারি না। কি থেকে কি হয়ে গেল। আমার মাথায় যেন্ আকাশ ভেঙ্গে পড়লো। আমি যোগে বিয়োগে মিলাতে পারি না। একি শুনছি মায়ার কথায়...। এই মায়া তো এসব কথা বলবে বিশ্বাস করতে পারছি না। মায়াকে মাত্র ২১ দিনে বদলে গেল! না আমার মাথায় কিচ্ছু ধরে না। আমার মনে পড়ে যায় ভাষাসৈনিক মুনীর চৌধূলী রচিত রক্তাক্ত প্রান্তর নাটকে তিনি লিখেছিলেন মানুষ মরে গেলে পচে যায়,বেচে থাকলে বদলায়। নাকি সেই রকম কিছু মায়ার ও জীবনে ঘটেছে। না আমার কিচ্ছু ভালো লাগছে না। মায়া শুধু আমার...। মায়াকে কল দিচ্ছি কিন্তু মায়া আগের মত কল রিসিভ করে না। মিসকল তো দূরে থাক। কয়েকশত বার কল দেওয়ার পর কিছুক্ষন আগে রিসিভ করে মায়া হুংকার ছাড়লো আমাকে আর কখনো কল দিয়ে জ্বালাতন করবে না। আমি আরেকজনকে ভালোবাসি। এই বলে লাইন কেটে যায়। ততক্ষণে আমার দুচোখ বেয়ে কয়েকফোটা জল গড়িয়ে পড়লো বিছানায়। আমি একটু স্থির হয়ে ভাবতে থাকি যে মায়া এক নজর আমাকে না দেখলে পাগল হয়ে যেতো। সেই মায়া এখন কী বলে...। আমার কোন ফ্রি বন্ধু বান্ধব নেই যার কারনে এ ব্যাপারটি শেয়ার করতে পারিনি। ইচ্ছায় ও অনিচ্ছায় তারপর ও আরো কত শত বার মায়াকে কল দিয়েছি। মায়া বড়জোর ৬/৭ বার রিসিভ করেছে। তাও ৪ বার ফোনের কল ধরে কথা না বলে কেটে দিয়েছে। তাছাড়া আজকাল মায়াকে মুঠোফোন বন্ধ করে রাখে। তাতে আমার কিছু ক্সতি না হলেও কিন্তু আমি যে মায়াকে এক মূহূর্তের জন্য ও ভুলতে পারছি না। এখনো রাতে ঘুমাতে গেলে কিংবা বর্তমান কোন আড্ডায় যোগ দিলে তার কথা মনে পড়ে । শত রাগ অভিমান আর ঘৃণা করার পর ও মায়াকে বলতে ইচ্ছে করে মায়া আমি এখনো তোমাকে ভালোবাসি।
আজিম উল্যাহ হানিফ
ডিগ্রি ১ম বর্ষ,কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজ।
মোবাইল-০১৮৩৪৩৮৯৮৭১/০১৬২০-৬২৪৫১৭

No comments for: "এখনো ভালোবাসি তোমায়..."
Leave a Reply