শনিবার ম্যাচের পর ক্ষোভ আর হতাশার মাঝেও অবিশ্বাস ঝরেছে মুশফিকুর রহিমের কণ্ঠে, 'একবারও মনে হয়নি যে ম্যাচটা আমরা হারব।' বাংলাদেশের জাহাজডুবির সময় একবার টিভি ফ্রেমের ভেসে ওঠা সাকিব আল হাসানের অভিব্যক্তি থেকে ঠিকরে বেরোচ্ছিল মহা বিস্ময়।
আফগানিস্তানের কাছে হারের ২৪ ঘণ্টা পরও বিস্ময়ে হতবাক টিম ম্যানেজমেন্টের এক সদস্য, 'জানি না কেন এমন হলো, এমন হচ্ছে!' সমস্যার সমাধান যে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না, সেটি গত কিছুদিন ধরেই শোনা যাচ্ছে অধিনায়কের কণ্ঠেও। সমাধান যে নেই, তা নয়। সমাধানের পথ খেলোয়াড়রা নিজেরা যেমন জানেন, তেমনি পই পই করে বলে দেওয়া হচ্ছে কোচিং স্টাফের পক্ষ থেকেও। 'জনৈক' স্ট্যানিকজাই যদি বুঝতে পারেন যে শেষ পর্যন্ত টেনে নিয়ে গেলে লড়াইয়ের পুঁজি ঠিক উঠে যাবে স্কোরবোর্ডে, ক্রিকেট সাফল্যের মামুলি এ সূত্রটি মমিনুল হক, নাসির হোসেন কিংবা নাঈম ইসলাম জানেন না- এটা অবিশ্বাস্য। তাঁরা জানেন এবং অতীতে একাধিকবার সে সূত্র প্রয়োগ করেও দেখিয়েছেন মমিনুল-নাসির। তাহলে সেই ক্রিকেটাররাই কেন এখন সেটি পারছেন না? প্রত্যেক ক্রিকেটারের ক্যারিয়ারেই দুঃসময় আসে। সমস্যা হলো সেই দুঃসময় একসঙ্গে জাপ্টে ধরেছে নাসির-মমিনুলকে, যে দুজনকে মনে করা হয় বাংলাদেশ দলের সবচেয়ে ঠাণ্ডা মস্তিষ্ক। তবে ক্রিকেটে মনের যোগ এতটাই বেশি যে দুঃসময়ের চাপে আড়ষ্ট হয়ে পড়তেন শচীন টেন্ডুলকারও। বাংলাদেশ দলের অন্দরমহলের পর্যবেক্ষণ, 'এখন দলে সবচেয়ে বেশি চাপে আছে নাসির হোসেন, কী যে অসহ্য চাপ!' অথচ এই নাসির হোসেনই মাস ছয়েক আগে জিম্বাবুয়ে সফরের শেষপ্রান্তে বলছিলেন, 'চাপ-টাপ আমার নেই। ক্রিকেটটা খেলি উপভোগ করি বলেই। যত দিন খেলব খেলাটা উপভোগ করব।' আফগানিস্তান ম্যাচে চারবার 'লাইফ' পেয়েও তাঁর উইকেট দিয়ে আসা পর্যন্ত পুরোটা সময়ে একবারও মনে হয়নি যে ব্যাটিংটা উপভোগ করছেন নাসির। ব্যাটিংটাই যেন ভুলে গেছেন 'মি. কন্সিসটেন্ট'! আর এ ব্যর্থতার প্রভাব পড়ছে নাসিরের ফিল্ডিংয়েও। টিম ম্যানেজমেন্ট অন্তত তাই মনে করে যে, একটা ব্যর্থতার চাপে বাকি কাজগুলোও ভুলে যাচ্ছেন নাসির। উত্তরটাই খুঁজে পাচ্ছে না বাংলাদেশ এই সেদিনও সব ফর্মে বাংলাদেশের সফলতম ব্যাটসম্যানকে দীর্ঘ মেয়াদে রক্ষার একটা পথই খোলা আছে টিম ম্যানেজমেন্টের সামনে। আপাতত ম্যাচের বাইরে রেখে তাঁকে মানসিক অবসাদ থেকে মুক্তি দেওয়া। যেন 'ফ্রেশ' হয়ে আবার চেনা রূপে মাঠে ফিরে আসেন নাসির। কিন্তু সে ব্যবস্থাও চট করে নিতে পারছে না দল। কারণ সোহাগ গাজীর চোটের কারণে যাঁকে পরিবর্তন ক্রিকেটার হিসেবে দলে নেওয়া হয়েছে, সেই মাহমুদ উল্লাহকে এ টুর্নামেন্ট থেকে বাদ দেওয়া হয়েছিল ফর্মহীনতার কারণেই। এ অবস্থায় নাসিরের বিকল্প হিসেবে ব্যর্থ কিংবা একেবারে আনকোরা কাউকে খেলানোর ঝুঁকি নিতে হবে, যে ঝুঁকির বিনিময়ে সাফল্যের চেয়ে প্রবল সমালোচিত হওয়ার আশঙ্কাই বেশি। কারণ, 'হারলে তো আর কেউ কোনো যুক্তির কথা শুনবেন না', মন্তব্য জাতীয় দলের এক সদস্যের। তাঁর আশঙ্কা অবশ্য মিথ্যা হওয়ার সম্ভাবনাও নেই। আফগানিস্তানের কাছে হার এতটাই অযৌক্তিক মনে করছে বাংলাদেশ যে কিছু যৌক্তিকতাকেও মনে হচ্ছে অবান্তর। তামিম ইকবাল, সাকিব আল হাসান ও মাশরাফি বিন মর্তুজা নেই। শনিবার একটা ওভার শেষ হওয়ার আগেই টুর্নামেন্ট থেকে ছিটকে গেছেন সোহাগ গাজী। তার ওপর একসঙ্গে দুঃসময় পাড়ি দিচ্ছেন নাসির হোসেন। সব মিলিয়ে দলে ভরসা করার মতো ব্যাটসম্যান মুশফিকুর রহিম। আফগানিস্তানের বিপক্ষে সেই ইনফর্ম ব্যাটসম্যানটিও কাটা পড়লেন আম্পায়ারের বাজে সিদ্ধান্তে। আগ বাড়িয়ে এসব যুক্তি এগিয়ে দিলেও কাল লুফে নেননি নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বাংলাদেশ দলের এক সদস্য, 'এসব বলে লাভ কী? তার পরও তো জেতার সুযোগ এসেছিল। নিজেরা ভুলগুলো না করলেই জিততাম।' এই নিজেদের ভুলগুলোর জন্যই আফগানিস্তান ম্যাচের পর সংবাদ সম্মেলন থেকে ফিরে গিয়ে ড্রেসিংরুমেও সতীর্থদের শাসিয়েছেন মুশফিক, 'এই দলটা আমার একার কিংবা অন্য কারো নয়, এটা দেশের ব্যাপার। এভাবে খেললে দলে কারোরই জায়গা নেই।' টিম ম্যানেজমেন্ট স্তম্ভিত আব্দুর রাজ্জাকের মতো সিনিয়র ক্রিকেটার ক্রিজের ভেতরে ব্যাট রাখতে কিভাবে ভুলে যান? আফগান ইনিংসের শেষ ওভারে দেওয়া দারুণ কার্যকর অফস্টাম্পের বাইরে ইয়র্কারগুলো কেন নিজের দ্বিতীয় স্পেলেই দিলেন না রুবেল হোসেন? উল্টো খাটো লেন্থে বল ফেলে স্ট্যানিকজাই-শেনওয়ারিকে তলোয়ার চালাতে উৎসাহিত করলেন! টেস্টে লম্বা ইনিংস যিনি খেলতে পারেন, সেই মমিনুল কেন ওয়ানডেতে শেষ পর্যন্ত টিকে থাকতে পারছেন না? এর সঠিক উত্তরটা জানা নেই মুশফিকের, টিম ম্যানেজমেন্টেরও। অনন্যোপায় হয়েই সম্ভবত টিম ম্যানেজমেন্ট আপাতত দুষছে ভাগ্যকে, 'জানি না! হতে পারে টানা অনেকগুলো জেতা ম্যাচ হারার হতাশা গ্রাস করেছে দলকে। নইলে এমন হবে কেন?' প্রশ্নের জালে আটকে পড়া বাংলাদেশ অবশ্য 'মুক্তি'র পথটা চেনে, 'একটা ম্যাচ জিতলেই দেখবেন সব ঠিক হয়ে গেছে।' কাঙ্ক্ষিত সেই জয় কবে আসবে- এর উত্তর আপাতত দলের একনিষ্ঠ সমর্থকও দিতে রাজি নন! -


No comments for: "একবারও মনে হয়নি যে ম্যাচটা আমরা হারব-মুশফিকুর রহিম"
Leave a Reply