নিজস্ব প্রতিনিধি,
আজ আন্দোলনের স্মৃতি জড়িত অমর একুশের গ্রন্থমেলার শেষ দিন অাজ। এক বছরের জন্য আবার থেমে যাবে লেখক-পাঠক-প্রকাশকদের মুক্তবুদ্ধি চর্চার মিলনক্ষেত্র এ গ্রন্থমেলা। আবেগ, উচ্ছ্বাস আর ভালবাসার এ মিলনমেলা এবার বাংলা একাডেমি চত্বরের পাশাপাশি মুক্তিযুদ্ধের চেতনা জাগ্রত সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে স্থান করে নিয়েছে। এছাড়া মানবতাবিরোধী অপরাধীদের সর্বোচ্চ শাস্তির দাবিতে গতবছর শাহবাগ চত্বরে তরুণ প্রজন্মের যে গণজাগরণ দেখা গেছে, সে চেতনাকে নানাভাবে বিশ্লেষণ করে প্রকাশিত একাধিক বই এবারে গ্রন্থমেলাকে দিয়েছে অন্যমাত্রা। এমনই নানা ঘটনার মধ্যদিয়ে আজ শুক্রবার পর্দা নামবে বাঙালির গর্বের ও জ্ঞানের মেলার। এ প্রসঙ্গে ঐতিহ্য প্রকাশনীর কর্ণধার আরিফুর রহমান নাইম বলেন, প্রত্যেকবারই মেলার শেষে আমাদের মন খারাপ থাকে। কারণ একমাস বইকে ঘিরে শিশু-বুড়ো, তরুণ-তরুণী থেকে শুরু করে নানা বয়সী মানুষের যে উৎসবের আমেজ থাকে, তার সঙ্গে নিজেকে যুক্ত করার সৌভাগ্য এ মেলা ছাড়া আর হয়ে ওঠে না। তাই মন খারাপ থাকে। তবে এবার সে কারণে মন খারাপের থাকলেও আরেকটি কারণে মন ভাল। সেটি হলো মেলার পরিসর এবার বেড়েছে এবং সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে এসেছে। এতে আমাদের দীর্ঘদিনের দাবি যেমন পূরণ হয়েছে, তেমনি বেচাকেনাও আগের চেয়ে বেশ ভাল হয়েছে। এবারের মেলার সেরা বই প্রকাশকদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, বরাবরের মতো এবারো বিক্রির শীর্ষে রয়েছেন নন্দিত কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদ। তিনি আমাদের মাঝে আর নেই, কিন্তু তার লেখা উপন্যাস ‘মুক্তিযুদ্ধ ও আমার বাবা’ বিক্রির র্শীষে রয়েছে। এর পাশাপাশি তাকে নিয়ে লেখা বিভিন্ন বই, স্মারকগ্রন্থও বেশ ভাল বিক্রি হচ্ছে। তার পরেই রয়েছে তার অনুজ মুহম্মদ জাফর ইকবালের বই। মেলায় বেশ ভাল বিক্রি হচ্ছে ঐতিহ্যের ঢাকা অভিধান ও গালি অভিধান, অনিন্দ্য প্রকাশনীর দেশ বিভাগ প্রভৃতি। এছাড়া বরাবরের মত এবারও মেলায় মোট বিক্রির শীর্ষে রয়েছে বাংলা একাডেমী। একাডেমীর অভিধান, প্রমিত বাংলা ব্যাকারণ, প্রমিত বাংলা বানানের নিয়ম, ফেরদৌসীর শাহনামা সমগ্র প্রভৃতি বেশ বিক্রি হচ্ছে। তরুণ লেখদের মধ্যে তৌহিদুর রহমান, পূরবী বসু প্রমুখের বইয়ের বিক্রি সন্তোষজনক বলে জানিয়েছেন প্রকাশকরা। হুমায়ুন আজাদ দিবস পালিত ২০০৫ সালের ২৭ ফেব্র“য়ারি পরমানু শক্তি কমিশনের সামনে প্রথাবিরোধী লেখক হুমায়ুন আজাদের উপর হামলা চালায় মৌলবাদী গোষ্ঠী। আর এ দিনটি স্মরণে আজ বৃহস্পতিবার হুমায়ুন আজাদের ওপর হামলাকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শান্তির দাবিতে বাংলা একাডেমীর বর্ধমান হাউজের সামনে প্রতিবাদ সভা করে লেখক,প্রকাশক ও পাঠকগণ। প্রতিবাদ দিবসটির আয়োজন করে আগামী প্রকাশনী।
নতুন বই বৃহস্পতিবার মেলার ২৭তম দিনে নতুন বই এসেছে ১২২ টি। এরমধ্যে গল্প-১৩টি, উপন্যাস-১২টি, প্রবন্ধ-৫টি, কবিতা-২৯টি, গবেষণা-৫টি, ছড়া-৫টি, শিশুতোষ-৮টি, জীবনী-৫টি, মুক্তিযুদ্ধ-২টি, বিজ্ঞান-১টি, ভ্রমণ-২টি, ইতিহাস-২টি, রাজনীতি-১টি, চিকিৎসা-৩টি, রম্য/ধাঁধা-১টি, ধর্মীয়-৩টি, অভিধান-১টি, সায়েন্স ফিকশন-২টি এবং অন্যান্য-২২টি। এছাড়া মেলার নজরুল মঞ্চে ১৫টি বইয়ের মোড়ক উন্মোচিত হয়েছে।
মেলার মূলমঞ্চে গ্রন্থমেলার মূলমঞ্চে আজ অনুষ্ঠিত হয় মুক্তিযুদ্ধের আদর্শের নবজাগৃতি ও তরুণ প্রজন্ম শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। এতে সভাপতিত্ব করেন অধ্যাপক মুনতাসীর মামুন। প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ড. সোনিয়া নিশাত আমিন। আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন শাহরিয়ার কবির, নাসির উদ্দীন ইউসুফ, নুজহাত চৌধুরী এবং আলম তালুকদার। প্রাবন্ধিক বলেন, শাহবাগের সাম্প্রতিক গণজাগরণ ছিল বিস্মৃতির বিরুদ্ধে স্মৃতির সংগ্রাম। ভ্রান্ত ইতিহাসের বিরুদ্ধে মুক্তিযুদ্ধের আদর্শের পুনর্জাগরণের লড়াই। এই আন্দোলনের একটি বিশ্ব-চারিত্র্য আছে। সারা বিশ্বের মৌলবাদ-জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে আন্দোলনের ক্ষেত্রে শাহবাগের যুদ্ধাপরাধবিরোধী আন্দোলন পথিকৃতের ভূমিকা পালন করবে। অধ্যাপক মুনতাসীর মামুন বলেন, শাহবাগের সাম্প্রতিক নবজাগৃতির চেতনায় ধর্মনিরপেক্ষ-মানবতাবাদীদের ঐক্যবদ্ধ হওয়ার সময় এসেছে।
বাংলা একাডেমি প্রবাসী লেখক পুরস্কার ২০১৩ প্রদান বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় গ্রন্থমেলার মূলমঞ্চে অনুষ্ঠিত হয় বাংলা একাডেমি প্রবাসী লেখক পুরস্কার ২০১৩ প্রদান অনুষ্ঠান। প্রবাসে বাংলা ভাষা-সাহিত্য ও সংস্কৃতি ক্ষেত্রে বিশেষ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ এ পুরস্কার প্রদান করা হলো। পুরস্কারপ্রাপ্ত লেখকরা হলেন- ইসহাক কাজল, ড. গোলাম আবু জাকারিয়া এবং ফারুক আহমদ। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী রাশেদ খান মেনন। অনুষ্ঠানে শুভেচ্ছা বক্তব্য প্রদান করেন একাডেমির মহাপরিচালক শামস্জ্জুামান খান। সভাপতিত্ব করেন বাংলা একাডেমির সভাপতি প্রফেসর এমেরিটাস আনিসুজ্জামান।
আজ অনুষ্ঠান
বৃহস্পতিবার মেলা শুরু হয় বেলা ৩টায় এবং শেষ হয় রাত ৯টায়। আজ শেষ দিন মেলা শুরু হবে সকাল ১১টায় এবং শেষ হবে যথারীতি রাত ৯টায়। আজ সকাল সাড়ে ১০টায় অমর একুশে উদ্যাপন উপলক্ষে অনুষ্ঠিত শিশু-কিশোর চিত্রাঙ্কণ, সংগীত এবং সাধারণ জ্ঞান ও উপস্থিত বক্তৃতা প্রতিযোগিতায় বিজয়ী শিশু-কিশোরদের পুরস্কার প্রদান করা হবে। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি থাকবেন শিশুসাহিত্যিক এখ্লাসউদ্দীন আহ্মদ। সভাপতিত্ব করবেন মোহিত কামাল। বিকেল ৪টায় গ্রন্থমেলার মূলমঞ্চে অনুষ্ঠিত হবে বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক বিস্ময়কর সাফল্যের উৎস এবং এর সাম্প্রতিক সমস্যা শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। প্রবন্ধ উপস্থাপন করবেন মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিন। আলোচনায় অংশগ্রহণ করবেন খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ, মেসবাহ কামাল এবং জিয়া রহমান। সভাপতিত্ব করবেন কাজী খলীকুজ্জামান আহমদ। গ্রন্থমেলার সমাপনী অনুষ্ঠান আজ সন্ধ্যা ৬টায় অমর একুশে গ্রন্থমেলা ২০১৪-র সমাপনী অনুষ্ঠান। এতে প্রধান অতিথি থাকবেন সংস্কৃতি মন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর। বিশেষ অতিথি থাকবেন সংস্কৃতি সচিব ড. রণজিৎ কুমার বিশ্বাস। শুভেচ্ছা বক্তৃতা দেবেন বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক শামসুজ্জামান খান। গ্রন্থমেলার প্রতিবেদন উপস্থাপন করবেন অমর একুশে গ্রন্থমেলা ২০১৪-র সদস্য-সচিব ও একাডেমির পরিচালক শাহিদা খাতুন। সভাপতিত্ব করবেন বাংলা একাডেমির সভাপতি এমেরিটাস অধ্যাপক আনিসুজ্জামান। সন্ধ্যায় পরিবেশিত হবে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।


No comments for: "অমর একুশে গ্রন্থমেলার শেষ দিন "
Leave a Reply