অভিযুক্ত ১০ জনের ছয়জনই নির্দোষ!

খবরটা টালমাটাল করে দিয়েছিল বাংলাদেশের ক্রিকেটকে। বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগে (বিপিএল) ফিক্সিংয়ের ঘুণপোকা ছড়ানোর খবর ক্ষোভ-হতাশার সঙ্গে জন্ম দিয়েছিল বিস্ময়েরও। এ ঘটনায় গঠিত বিসিবির শৃঙ্খলা কমিটির ট্রাইব্যুনালের দেওয়া কালকের রায়ও একই রকম বিস্ময়কর। আইসিসির দুর্নীতি দমন বিভাগ (আকসু) ফিক্সিংয়ে জড়িত বলে ১০ জনের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ আনলেও ট্রাইব্যুনাল এঁদের ছয়জনকেই নির্দোষ বলে রায় দিয়েছেন। রায়টা এমনই বিস্ময়কর যে ব্যতিক্রমী ঘটনার জন্ম দিয়ে বিসিবি এবং আইসিসি কিছুক্ষণের মধ্যেই এক যৌথ বিবৃতিতে এ নিয়ে হতাশা ও বিস্ময় প্রকাশ করেছে।
চারজন দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন, তবে এর মধ্যে তিনজনের ক্ষেত্রেই ট্রাইব্যুনালের কোনো ভূমিকা নেই। কারণ বাংলাদেশের সাবেক অধিনায়ক মোহাম্মদ আশরাফুল, শ্রীলঙ্কান অলরাউন্ডার কৌশল লোকুয়ারাচ্চি ও নিউজিল্যান্ডের ব্যাটসম্যান লু ভিনসেন্ট নিজেরাই তাঁদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ স্বীকার করেছেন। অভিযোগ অস্বীকার করা বাকি সাতজনের মধ্যে দোষী প্রমাণিত হয়েছেন শুধু ঢাকা গ্ল্যাডিয়েটরসের মালিক সেলিম চৌধুরীর ছেলে ও ফ্র্যাঞ্চাইজির ব্যবস্থাপনা পরিচালক শিহাব জিশান চৌধুরী। চট্টগ্রামে অনুষ্ঠিত ঢাকা গ্ল্যাডিয়েটরস-চিটাগং কিংস ম্যাচে ফিক্সিংয়ের অভিযোগে দোষী প্রমাণিত হয়েছেন তিনি।
রায় প্রদান শেষে ট্রাইব্যুনাল-প্রধান সাবেক বিচারপতি খাদেমুল ইসলাম বলেছেন, ‘আমরা ১০ জনের বিচার করেছি। এর মধ্যে তিনজন দোষ স্বীকার করেছেন। একজন দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন। এই চারজনের শাস্তির ব্যাপারে আবার শুনানি হবে।’ ট্রাইব্যুনালের এই সিদ্ধান্তে বিস্ময়ের মূল কারণ, আইসিসির দুর্নীতি দমন বিভাগ (আকসু) দীর্ঘ তদন্তের পর সুনির্দিষ্ট প্রমাণাদিসহই অভিযোগ এনেছিল নয়জনের বিরুদ্ধে। গত আগস্টে বিসিবি ও আইসিসির যৌথ সংবাদ সম্মেলনে সেটি জানানো হয়। সংবাদ সম্মেলনে অভিযুক্তদের নাম প্রকাশ না করা হলেও সেটি দ্রুতই সংবাদমাধ্যমে চলে আসে। অধিকতর তদন্তে বিপিএলে খুলনা রয়্যাল বেঙ্গলসের অধিনায়ক লু ভিনসেন্টের নামও যোগ হয় এই নয়জনের সঙ্গে।
অভিযুক্ত দশজনের ছয়জনকেই নির্দোষ বলে রায় দেওয়ায় প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়েছে আকসুর তদন্ত। আইসিসির তাই বিস্মিত ও হতাশ হওয়াই স্বাভাবিক। রায় ঘোষণার পরপরই বিসিবি ও আইসিসির যৌথ এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে সেটিরই প্রকাশ ঘটেছে, ‘আইসিসি ও বিসিবি সিদ্ধান্ত জেনেছে এবং তাতে একই সঙ্গে বিস্মিত ও হতাশ হয়েছে।’ পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়ার আগে লিখিত ও পূর্ণাঙ্গ রায়ের জন্য অপেক্ষা করবে বলেও জানানো হয়েছে বিবৃতিতে। দুই সপ্তাহ পর পূর্ণাঙ্গ রায় দেওয়ার কথা।
আকসুর নীতিমালা অনুযায়ী ফিক্সিংয়ের বিচারকাজের জন্য গত ১৪ অক্টোবর সাবেক বিচারপতি মোহাম্মদ আবদুর রশিদকে প্রধান করে ১১ সদস্যের শৃঙ্খলা কমিটি গঠন করে বিসিবি। ১০ নভেম্বর কমিটির সদস্য সাবেক বিচারপতি খাদেমুল ইসলামকে প্রধান করে গঠিত হয় তিন সদস্যের ট্রাইব্যুনাল। ট্রাইব্যুনালের অন্য দুই সদস্য আজমালুল হোসেন কিউসি ও সাবেক ক্রিকেটার শাকিল কাসেম।
২৪ নভেম্বর থেকে শুরু হয়ে একাধিক শুনানি শেষে কাল সংক্ষিপ্ত রায় ঘোষণা করা হয়। রায়ে আগেই অভিযোগ স্বীকার করা মোহাম্মদ আশরাফুল ও কৌশল লোকুয়ারাচ্চি সম্পর্কে কিছু বলা হয়নি। তবে জানা গেছে, তাঁদের দুজনের পক্ষ থেকে এরই মধ্যে লঘু শাস্তির জন্য আবেদন করা হয়েছে ট্রাইব্যুনালের কাছে। চূড়ান্ত রায় ও শাস্তি ঘোষণার আগে সেটি বিবেচনা করে দেখবেন ট্রাইব্যুনাল। একই আবেদন করতে পারবেন লু ভিনসেন্টও। প্রথম দফায় অভিযুক্ত ৯ জনের মধ্যে খুলনার হয়ে খেলা এই নিউজিল্যান্ডার না থাকলেও আকসু পরে তথ্য গোপন করার অভিযোগে অভিযুক্ত করে তাঁকে। আশরাফুল ও লোকুয়ারাচ্চির মতো তিনিও অভিযোগ স্বীকার করেছেন বলে জানিয়েছে সূত্র।
আইসিসির দুর্নীতি দমন বিভাগের কাছে মোহাম্মদ আশরাফুল বিপিএলের ফিক্সিংয়ে শুধু নিজে জড়িত থাকার কথাই স্বীকার করেননি, তাঁর জবানবন্দি থেকে বেরিয়ে আসে আরও অনেকের নাম। বিপিএল ছাড়িয়ে সেটি আন্তর্জাতিক ক্রিকেটেও ডালপালা ছড়ায়। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটেও স্পট ফিক্সিং করেছেন স্বীকার করে আশরাফুল দাবি করেন, বাংলাদেশের সাবেক তিন ক্রিকেটার খালেদ মাহমুদ, মোহাম্মদ রফিক ও খালেদ মাসুদ তাঁকে ফিক্সিং জগতের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের অংশটুকু নিয়ে তদন্ত করা হচ্ছে কি না বা ভবিষ্যতে করা হবে কি না—এ ব্যাপারে আইসিসি বরাবরই কোনো মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়ে এসেছে। তবে বিপিএল ফিক্সিং নিয়ে আকসুর তদন্ত চলেছে মূলত আশরাফুলের জবানবন্দির ভিত্তিতেই। কিন্তু বিচার শেষে বিস্ময়করভাবে দেখা গেল, ঢাকা গ্ল্যাডিয়েটরসের চেয়ারম্যান সেলিম চৌধুরী, তিন ক্রিকেটার মাহবুবুল আলম, মোশাররফ হোসেন ও ড্যারেন স্টিভেন্স, বোলিং কোচ মোহাম্মদ রফিক এবং ভারতীয় প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা গৌরব রাওয়াত দোষী নন! কালকের এই রায়ের পর মোশাররফ ও মাহবুবুলের ওপর বিসিবির অধীনে যেকোনো ধরনের ক্রিকেট খেলায় যে নিষেধাজ্ঞা ছিল, সেটিও উঠে গেছে তাৎক্ষণিকভাবে। অথচ ঢাকা গ্ল্যাডিয়েটরসের মালিক সেলিম চৌধুরীর বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল চারটি; মাহবুবুল, মোশাররফ ও স্টিভেন্সের বিরুদ্ধে দুটি করে; মোহাম্মদ রফিকের বিরুদ্ধে তিনটি এবং রাওয়াতের বিরুদ্ধে পাঁচটি।
রায় প্রদানের সময় অভিযুক্তদের মধ্যে সশরীরে উপস্থিত ছিলেন শুধু আশরাফুল ও স্টিভেন্স। রায়ের পর গুলশানের ট্রাইব্যুনাল কার্যালয় থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সময় উপস্থিত সাংবাদিকেরা আশরাফুলের সঙ্গে কথা বলতে চাইলেও তিনি কোনো কথা না বলেই চলে যান। তবে প্রায় সব অভিযুক্তের আইনজীবীকেই আনন্দিত মনে হয়েছে। কেউ কেউ বিজয়চিহ্নও দেখিয়েছেন। মোহাম্মদ আশরাফুল ও ড্যারেন স্টিভেন্সের পাকিস্তানি বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ আইনজীবী ইয়াসিন প্যাটেল উপস্থিত সাংবাদিকদের একটি লিখিত বিবৃতি পড়ে শোনান। তাতে ঘোষিত রায়ে সন্তোষ প্রকাশ করেন তিনি। মোশাররফ-মাহবুবুলের আইনজীবী নূরুস সাদিক বলেন, ‘আমরা দেশের মর্যাদা রাখতে সক্ষম হয়েছি। আমার মক্কেলদের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি। ট্রাইব্যুনালের রায়ে আমি খুশি। আমার মক্কেলরা সিদ্ধান্ত জেনেছেন, তাঁরাও খুশি।’


ঢাকা গ্ল্যাডিয়েটরসের আইনজীবী নওরোজ এম আর চৌধুরী বলেছেন, ‘বিচারে ঢাকা গ্ল্যাডিয়েটরস দোষী হয়নি, তবে ব্যক্তিগতভাবে একটা অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন শিহাব চৌধুরী। পূর্ণাঙ্গ রায় পেলে আমরা পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেব।
Related Labels:

No comments for: "অভিযুক্ত ১০ জনের ছয়জনই নির্দোষ!"


Leave a Reply

সম্পাদক: শফিকুল আলম সেলিম।
বার্তা সম্পাদক: এ.আর.আকাশ।
কার্যালয়: বাদুরতলা, কুমিল্লা।
ই-মেইল: desherbarta24@gmail.com

পাঠক সংখ্যা

Log In


Followers

Arsip Blog

Join the Club

To Cell

To Cell

AD

AD

AD

AD

AD

AD

Category 3

?max-results="+numposts2+"&orderby=published&alt=json-in-script&callback=recentarticles2\"><\/script>");
Powered by Blogger.

More Latest