প্রিজন ভ্যান থেকে পালিয়ে ধরা পড়ার ১৪ ঘণ্টা পরই কথিত বন্দুকযুদ্ধে নিহত
হলেন জেএমবির নেতা হাফেজ মাহমুদ ওরফে রাকিব হাসান (৩৫)। তবে সংশ্লিষ্ট মহল
এই ‘বন্দুকযুদ্ধ’ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
গত রোববার ত্রিশালের সাইনবোর্ড এলাকায় প্রিজন ভ্যানে গুলি-বোমা হামলা চালিয়ে এক পুলিশ সদস্যকে হত্যা ও দুজনকে আহত করে হাফেজ মাহমুদসহ জেএমবির তিন জঙ্গিকে ছিনিয়ে নিয়ে যান তাঁদের সহযোগীরা। রোববার বেলা আড়াইটার দিকে টাঙ্গাইলের সখীপুর উপজেলার সখীপুর-গোড়াই সড়কের তক্তারচালায় একটি সিএনজি অটোরিকশা থেকে হাফেজ মাহমুদকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। এরপর সোমবার ভোর চারটার দিকে সখীপুর-গোড়াই সড়কের মির্জাপুর থানা অংশের বেলতৈল সিরামিকস এলাকায় বন্দুকযুদ্ধে তিনি নিহত হন বলে পুলিশ দাবি করে।
মির্জাপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) গোলাম মোস্তফা প্রথম আলোকে বলেন, টাঙ্গাইল ও ময়মনসিংহ জেলা পুলিশের একটি দল গভীর রাতে হাফেজকে নিয়ে মির্জাপুরের বেলতৈল সিরামিক এলাকায় অস্ত্র উদ্ধারে অভিযান চালায়। ভোররাত সাড়ে চারটার দিকে সেখানে পুলিশের ওপর একদল অস্ত্রধারী হামলা চালালে পুলিশ আত্মরক্ষার্থে পাল্টা গুলি ছোড়ে। উভয় পক্ষের মধ্যে গুলিবিনিময়ের সময় হাফেজ গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান। তাঁর লাশ মির্জাপুরের কুমুদিনী হাসপাতালে পাঠানো হয়।
ওসির দাবি, এ ঘটনায় পুলিশের তিন সদস্য আহত হয়েছেন। এঁরা হলেন সখীপুর থানার কনস্টেবল মোজাম্মেল হক, গোয়েন্দা পুলিশের কনস্টেবল আসাদ মিয়া ও গোলাম মওলা। তাঁদের টাঙ্গাইলের পুলিশ লাইন হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
তবে সংশ্লিষ্ট একাধিক পুলিশ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, হাফেজ মাহমুদকে ধরে নিয়ে হত্যা করা হয়েছে। তাঁর কাছে নতুন কোনো তথ্য পাওয়ার ছিল না বলেও কর্মকর্তারা দাবি করেন। এ ঘটনা অন্য জঙ্গিদের ক্ষেত্রে উদাহরণ হয়ে থাকবে বলে তাঁরা মনে করেন।
কথিত বন্দুকযুদ্ধে কোনো জঙ্গি নিহত হওয়ার ঘটনা দেশে এটাই প্রথম।
কুমুদিনী হাসপাতালের একটি সূত্র জানায়, সোমবার ভোর পাঁচটার কিছু পরে হাফেজ মাহমুদকে হাসপাতালে আনা হয়। তবে হাসপাতালে আনার আগেই তাঁর মৃত্যু হয়। এরপর টাঙ্গাইলের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ফিরোজ মাহমুদের উপস্থিতিতে লাশের সুরতহাল করা হয় এবং ময়নাতদন্তের জন্য মরদেহ টাঙ্গাইল জেনারেল হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়।
মর্গে লাশ নিতে আসেন বাবা: গতকাল বিকেলে টাঙ্গাইল জেনারেল হাসপাতাল মর্গে ছেলের লাশ নিতে আসেন অবসরপ্রাপ্ত স্কুলশিক্ষক আবদুস সোবহান। তিনি জানান, রোববার দুপুরে টেলিভিশনে খবর দেখে তাঁরা জানতে পারেন, হাফেজ মাহমুদকে ছিনিয়ে নিয়ে গেছেন তাঁর সহযোগীরা। এ খবর শোনার পর থেকেই তাঁরা দুশ্চিন্তায় ছিলেন। বিকেলে ধরা পড়ার খবর পান তাঁরা। এর পর থেকে হাফেজ মাহমুদের মা ‘ছেলেকে মেরে ফেলা হবে’—এ আশঙ্কায় কাঁদতে থাকেন। পরে গতকাল সকালে সত্যি সত্যিই মৃত্যুর খবর পান। দুপুরের দিকে জামাতাকে সঙ্গে নিয়ে একটি অ্যাম্বুলেন্স ভাড়া করে জামালপুরের মেলান্দহ থেকে টাঙ্গাইলে আসেন তিনি। সন্ধ্যায় তাঁর লাশ নিয়ে পুলিশ পাহারায় টাঙ্গাইল থেকে জামালপুরের উদ্দেশে রওনা হন সোবহান। এ সময় তিনি কাঁদতে কাঁদতে বলেন, ‘কারও বিরুদ্ধে আমার কোনো অভিযোগ নেই। ছেলে মরে গেছে, এখানেই সব শেষ।’
সোবহানের দুই ছেলে ও দুই মেয়ের মধ্যে হাফেজ দ্বিতীয়। আট বছর আগে গ্রেপ্তার হওয়ার পর বেশ কয়েকবার ঢাকা, কাশিমপুর ও ময়মনসিংহ কারাগারে গিয়ে ছেলের সঙ্গে দেখা করেছেন বলে জানান। সর্বশেষ ২০১২ সালের জানুয়ারি মাসে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে দেখা হয়।
সোবহান জানান, রাজধানীর বাসাবোতে একটি মাদ্রাসায় লেখাপড়ার সময়ই জেএমবির সঙ্গে যুক্ত হন হাফেজ মাহমুদ। পরিবারের লোকজন বিষয়টি জানতে পারেন ২০০৬ সালে গ্রেপ্তার হওয়ার পর।


No comments for: "‘বন্দুকযুদ্ধে’ প্রথম জঙ্গি নিহত"
Leave a Reply